সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। এসব দেশের শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে শক্তিশালী উত্থান। বিশেষ করে আফ্রিকার আর্থিক বাজারের আকর্ষণ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এক্ষেত্রে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা রাখছে ধাতব পণ্যের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংস্কার, মুদ্রার স্থিতিশীলতা ও আর্থিক বাজারের শক্তিশালী অবস্থান। খবর এফটি।
কয়েক বছর আগেও মুদ্রার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন ও দায়দেনা পরিশোধে ব্যর্থতা ছিল এখানকার দেশগুলোর নিয়মিত চিত্র। বর্তমানে সে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠেছে এখানকার বাজারগুলো। বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান ঘোলাটে পরিস্থিতি স্বর্ণ ও ধাতব পণ্যের মতো বাস্তব সম্পদের বিনিয়োগ চাহিদাকে ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে তুলেছে। এতে খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মহাদেশটিতে বিনিয়োগের আকর্ষণ আরো বেড়েছে।
চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও মরক্কোর শেয়ারবাজারের আকার বেড়েছে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ (মার্কিন ডলারের হিসাবে)। একই সময় ২০১৭ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় থাকা এমএসসিআই উদীয়মান বাজার শেয়ারসূচক ৩১ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি বছর এমএসসিআই সূচকের বাজারমূল্য ৫ ট্রিলিয়ন বা ৫ লাখ কোটি ডলার বেড়ে ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে এশিয়ার চিপ প্রস্তুতকারক ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারমূল্য। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত (এআই) শেয়ারগুলো বাজারের উত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এতে বাজারে বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারী ও বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় হেজিং বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে আফ্রিকার মতো কম পরিচিত বাজারগুলোয় বিনিয়োগ করা উচিত বলে মনে করছেন তাদের অনেকেই। বিশেষ করে ধাতু, ভোক্তাপণ্য ও ব্যাংক খাতের শেয়ারের বিনিয়োগের মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে উদীয়মান বাজারের প্রচলিত সুযোগগুলো আরো ভালোভাবে আদায় করে নেয়া সম্ভব বলে অভিমত তাদের।
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা রেডহুইলের ইমার্জিং অ্যান্ড ফ্রন্টিয়ার মার্কেট বিভাগের কো-হেড জেমস জনস্টোন বলেন, ‘আফ্রিকার জন্য সত্যিই একটি নতুন সময় এসেছে। এখানে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা রাখছে ধাতব পণ্যের শক্তিশালী বাজার। ২০২২ সালের পর থেকে অঞ্চলটিতে সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের হার কমে এসেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার ধারণা, এরই মধ্যে ডিজিটাল সম্পদে পুরোপুরি বিনিয়োগ করে ফেলেছে বিশ্ব। এ অবস্থায় বিনিয়োগ বৈচিত্র্যায়ণে আগ্রহীদের পোর্টফোলিওতে আফ্রিকান পণ্যের মতো বাস্তব সম্পদ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।’
কয়েক বছর আগেও অর্থনৈতিক ধস ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মোকাবেলা করতে হয়েছে আফ্রিকার ছোট আর্থিক বাজারগুলোকে। চলতি বছরেও এসব বাজারের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন বাণিজ্য বাধা ও সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাব। এর মধ্যেও এসব বাজারেই সম্পদ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঘানা ও জাম্বিয়ার শেয়ারবাজারের আকার বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এর কারণ হলো দেশ দুটির প্রধান রফতানি পণ্য স্বর্ণ ও তামার দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। এতে ঋণ পরিশোধের চাপ থেকে দেশগুলো দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারছে।
লন্ডনভিত্তিক অল আফ্রিকা পার্টনারসের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক ফারুক মিয়ার মতে, অর্থনৈতিক ও মুদ্রানীতির সংস্কারের কারণে আফ্রিকার মুদ্রা ও শেয়ারের মান উন্নত ও স্থিতিশীল হয়েছে।
চলতি বছরে ডলারের সঙ্গে বিনিময় হারে ঘানার মুদ্রা সেডি, জাম্বিয়ার কওয়াচা ও কঙ্গোর ফ্রাঁর বিনিময় হার বেড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। বৈশ্বিক মুদ্রার র্যাকিংয়ে এসব মুদ্রা এখন রাশিয়ার রুবলের পরই অবস্থান করছে। দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতির হারও এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে স্থিতিশীল রয়েছে নাইজেরিয়ার মুদ্রা নায়রার বিনিময় হার। এর আগে রেকর্ড অবমূল্যায়নের মধ্য দিয়ে গেছে মুদ্রাটি।
চলতি বছর আফ্রিকার সরকারগুলোয় ডলারে নেয়া ঋণের চাহিদা বেড়েছে। তবে সুদহার ১০ শতাংশের কম হলেও নতুন ঋণ অনেক ব্যয়বহুল। কেনিয়া ও অ্যাঙ্গোলা সম্প্রতি বন্ড বিক্রি করে পুরনো ঋণ পুনর্গঠন করেছে। এ ধরনের পদক্ষেপ গত বছরও কঠিন ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে সেনেগাল। গোপন ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে দেশটির আর্থিক বাজার অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বন্ডের ইল্ড প্রায় ১৩ শতাংশ।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ার সরকারি বন্ডগুলো চলতি বছর জেপি মরগানের উদীয়মান বাজার স্থানীয় মুদ্রা ঋণ সূচকের ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে, যা বছরের সেরা পারফরম্যান্স। গত মাসে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের মানি লন্ডারিং গ্রে লিস্ট থেকে বাদ পড়েছে দেশ দুটি, যা দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ার ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক। পাশাপাশি উভয় দেশে কাঠামোগত সংস্কার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার মুদ্রা র্যান্ডে বিক্রি হওয়া ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড গত এপ্রিলে বৈশ্বিক শুল্ক আতঙ্কের সময় ১১ শতাংশের বেশি থেকে কমে ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে, যা ২০১৮ সালের পর সর্বনিম্ন। দেশটির আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকরা এখন মূল্যস্ফীতিকে ৩-৬ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখার লক্ষ্য নিয়েছেন। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারবে। এতে ভবিষ্যতে সুদহার আরো কমানো সহজ হবে।
অতীতেও ধাতুপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার শেয়ারবাজার সূচক ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠতে দেখা গেছে। কিন্তু পরে তা আবার দ্রুত কমেও গেছে। গত দশকে নাইজেরিয়ায় এমনটি দেখা গিয়েছিল। তবে রেডহুইলের জেমস জনস্টোন বলেছেন, ‘বিগত কয়েক বছরে আফ্রিকার আর্থিক বাজারে আন্তর্জাতিক তহবিলের প্রভাব কমেছে। চলতি বছর বেশির ভাগ কার্যক্রমই স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। উচ্চ ইল্ডযুক্ত স্থানীয় বন্ড থেকে নগদ অর্থ তুলে নিয়ে কম দামের ব্যাংক শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন তারা।’
তিনি আরো জানান, আফ্রিকার কিছু শেয়ারবাজার সূচকে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। কিন্তু এখনো শেয়ারগুলো অনেক সস্তা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সেখানে খুব কমই বিনিয়োগ করেছেন।